ক বি-প্রা ব ন্ধি ক অ ভি জি ৎ দা শ গু প্ত
অভিজিৎ দাশগুপ্ত
জন্ম: ১৭ই জানুয়ারি, ১৯৭০। কলকাতায়। বাবার রেলের চাকরির সুবাদে শৈশবে ভাগলপুর, রামপুরহাটে বসবাস। বর্তমানে কলকাতাবাসী। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা বিভাগে স্নাতকোত্তর। পেশায় শিক্ষক। পাশাপাশি অব্যাহত সাহিত্য চর্চা । এ পর্যন্ত নটি কাব্যগ্রন্থ এবং গদ্যগ্রন্থ চারটি। গদ্য গ্রন্থগুলি গবেষণাপ্রসূত।
'খোয়াই ' নামে একটি পত্রিকার সম্পাদনার সঙ্গে যুক্ত। ' আত্মদ্রোহ সাহিত্যকৃতি সম্মান ' লাভ ২০১৬- তে। প্রিয় শখ ইতিহাস চর্চা ও ভ্রমণ।
©/কবির সঙ্গে, কবিতার সঙ্গে
রজকিনির হাঁস-এর কবি:নিয়তির মতো
অভিজিৎ দাশগুপ্ত
কবিতার সহজাত প্রবণতা বার্তা নির্ভরতা।এই বার্তা সমাজ স্বীকৃত হতে পারে, হতে পারে বিশ্বাসজনিত কোন ভাষ্য, অথবা পাশাপাশি থাকা ধর্মীয়-রাজনীতি-নারীবাদ ইত্যাদি ইত্যাদি । কিন্তু তারপরেও এক ধরনের কবিতা থাকে; যে কবিতার উৎসর্গ পত্রে কবি বলতে পারেন, ' যাঁরা একদিন রজকিনির হাঁস /খুঁজতে বেরিয়েছিলেন /যাঁরা একদিন রজকিনির হাঁস/খুঁজতে বেরোবেন '। তপন রায়। উত্তরবঙ্গের এই কবির লেখায় বারবার এসেছে অতিরিক্ত এক উড়ান। তার ডানায় ভর দিয়ে ঐকান্তিক ভাবেই এই কবির কবিতার প্রসন্নতার ভেতর প্রবেশ করা যায়।
তপন রায় -এর তিনটি কাব্যগ্রন্থের কথা আমার জানা। প্রথমটি ' বিধুর লন্ঠন '(১৯৯৩),দ্বিতীয় 'রজকিনির হাঁস ' (২০০৫) আর তৃতীয় 'সহজ তোমার হাত '(২০০৮)।
যাত্রা শুরু সম্ভবত ১৯৯৩। এরপরেও হয়তো আরো কিছু কবিতার বই প্রকাশিত হয়েছে। কবি হিসেবে তাঁর লেখার প্রতি কৌতূহলবশত একদিন পড়া শুরু হয়। প্রথম পাঠেই এই বিস্ময়ের প্রসন্নতা এসে ঘিরে ধরেছিল। সেখানে বেশকিছু পংক্তির ভেতর নিজস্ব সত্তাকে খুঁজে পাবেন পাঠক। যেমন এই কবিতাটি,
'নতুন ধানের চাল চড়িয়েছ সাবেকি হাঁড়িতে
অধুনা পুরনো চাল ভয়ে তুমি ব্যবহার করো না
আপাত মৃদুল তবু সূর্যমুখী তোমার আঙুল
রজকিনি, শীল হাতে অপরাহ্নে ফেলে দিলে
নীল সসপ্যান থেকে শান্ত চাল-ধোওয়া জল
যেহেতু নিম্নগামী, তোমারই প্রশ্রয়ে দেখি
নেমে যায় সীমারেখায়
তোমার বাড়ির পথ, যেতে যেতে, বনের বিজনে
আবার হলুদ হলো এসময় '
( জুলাই )
কবিতাটি পড়ার সময় জুলাই মাসের অনুষঙ্গকে সামনে রেখেও কেমন একটা বাংলার লোকজ ঐতিহ্যের গন্ধ পাওয়া যায়। শুধু তাই নয়, সেখানে কোথাও যেন মানুষের জীবনের বিভিন্ন পর্যায়গুলো ফুটে ওঠে; যখন দেখি পুরনো চাল ব্যবহার না করার ভাবনার কাজ করেছে ভেতরে ভেতরে। কবিতা বিচারের ভার গ্রহণ করা মুর্খতার সামিল। এ এক অনুভব থেকে অন্য অনুভবে যাত্রা। কবি যা লিখলেন, মেজাজে যা ছুঁয়ে দিলেন; তাকে পাঠক তার শুষে নেওয়া মন থেকে অন্য মেজাজে স্বপ্নকথনের মতো গ্রহণ করবেন, সেটাই কাম্য। পাশাপাশি একটা ভয়ও কাজ করে। কাজ করে নিষ্ঠুরতার মতো নির্মমতা। আসলে কবিতার অনুভূতিকে যদি ধরতে না পারি, তাহলে সব উচ্চারণ অনুচ্চারিত থেকে যাবে। তপন রায়ের কবিতা পড়তে পড়তে তার স্তরায়ণগুলোকেও লক্ষ্য করবেন পাঠক। কখনো 'খরগোশ' কবিতায় আমাদের জানা বিষয়ের বিপরীত কাহিনী উপস্থিত করছেন তিনি। যে কাহিনী আমাদের জানা বিষয় থেকে সম্পূর্ণ বিপরীত ধারণা তুলে ধরে। কবিতার কচ্ছপটি জানে প্রতিযোগিতায় খরগোশ কেন পিছিয়ে পড়েছে।
'জয়ের শিরোপা নিয়ে নতমুখ তোমাকে বুঝেছি--প্রতিযোগিতার পথে যেতে যেতে হলুদ বনের পথে ঘুমিয়ে পড়েছ তুমি সে কি অহং? না তোমার নিরুদ্দিষ্ট সঙ্গোপন প্রেম শুধু জেতায় কচ্ছপে?
তর্কের বাগান থেকে দূরে কচ্ছপের চোখে আসে জল'
এই প্রেম এই অকৃত্রিম ভালোবাসার জন্য তৈরি শব্দগুলো আমাদের মনের ভেতরেও সঙ্গীর প্রতি জাগিয়ে তোলে সহজ অথচ নিবিড় স্পর্শ।
কবিতা নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষার পথে হেঁটেছেন কবি । তাই ' চাঁদ রিমেক ' কবিতাটি একই সঙ্গে গদ্য-পদ্যের মিশেল। কিন্তু সব মিলিয়ে একটা ভালো লাগা একটা সহজ অথচ নির্জনতা পাওয়া যায়। তীর্যক দৃষ্টিভঙ্গিও পাওয়া যায় এতে। যদিও এই ধরনের কবিতা খুব বেশি নেই। কখনো কখনো কবির মনে একটু অন্যরকম হওয়ার ইচ্ছে থেকেই মনে হয় এমন সৃষ্টি।
নিঃশব্দ এক দর্শন কবিতাকে দাঁড় করিয়ে রেখেছে। তাই দক্ষ হাতে ছোট ছোট বিষয়কেও কবিতার ভাষায় নতুন করে তুলে ধরেছেন কবি। মননশীল সেই উচ্চারণ আমাদেরকেও বিপরীত স্নানে শীতল করে।
'তবু তুমি ভেবে দেখ ভেবে-দেখবার ব্যবহারক্রম
ভেবে-দেখবার রীতিনীতি
ভেবে দেখা ভালো মনে হয়
পূর্ণপতনের আগে একবার
ব্যবহৃত হওয়া ভালো
ব্যবহার না জেনে
দুষ্টু পেঁয়াজের খোসা তুমি
ছাড়াতে যেও না '(তবু)
একটা কবিতাকে কীভাবে ভাঙচুর করে নতুন আঙ্গিকে প্রতিষ্ঠা করা যায় তার নমুনা বোধহয় এই কবিতাটি। ভেবে দেখা দিয়ে শুরু করে শেষে ব্যবহারে শেষ করছেন কবি। এবং সবশেষে তিনি খুব সংযমের সঙ্গে বাস্তবকে নিয়ে এসেছেন। কিন্তু তার মধ্যেও একটা নির্লিপ্তি কাজ করেছে।
' সহজ তোমার হাত ' এক ফর্মার বই । কিন্তু তার মধ্যেই তিনি সময়ের পরিবর্তনকে তুলে ধরেছেন নিজের অক্ষয় কলমে। উৎসর্গ কবিতায় তার ইঙ্গিত দিচ্ছে শেষ দুটি পংক্তি।
'দেখো, কাগজ-কলম, নেশা, কাঁধের ঝোলানো ব্যাগ ল্যাপটপ
সঙ্গে রেখো না কিছু, দূরভাষে বান্ধবীও নয় '
সত্যি বলতে কি, এর পরেও কি আর কিছু বলার থাকে ! তবু বলতে হয়। এই বইয়ের নামহীন কবিতাগুলির প্রতিটির মধ্যেই রয়েছে জীবনের সঙ্গে বন্ধুত্ব করার বহু প্রাচীন অভীপ্সা। কবিতা লেখার খাতাটি প্রতিদিন ভরে ওঠে 'বেদনায়, খরায়, অনতিঅক্ষরে'। কত পেত্নীর হাসি, বিবিধ অসহযোগ, যৌন অট্টহাসি, নদীর বিজ্ঞান সব সব এসে ওঠে কবিতা লেখার পৃষ্ঠায়। উত্তরবঙ্গের কবি তবু ভুলতে পারেন না তাঁর প্রকৃতিকে। তাই
'কবিতা লেখার খাতা একদিন প্রকৃতই হাতিপ্রেমিকের হাহাকারে ভরে যাবে ' বলে তাঁর মনে হয়েছে।
তপন রায়ের কবিতায় প্রেম এসেছে ঘুরে ফিরে। কখনো সে সংসারী মন নিয়ে অপেক্ষারত, কখনো বা অভিমান খেলা করেছে তার মেঘের মতো দুই চোখে। কবি নীরবে বন্ধুর মতো জলছবি এঁকে রাখেন অমীমাংসিত ভালোবাসায়।
'তোমার স্বপ্নে কোন ডোরাকাটা নেই
ঘুমে অতিশাদা হাজার রজনী
বালিকার ফ্রকের ভিতর ছোট্ট, সরল
তুমি, গরমের ছুটি পেয়ে কিঞ্চিত পৃথুল
ছিল কি তোমার স্বপ্নে কোনো ফ্রয়েডের হাত
আমারো উচ্চতা আজ নিশ্বাসের মতো
ক্রমশ বামন তাই বালিকা উঁচু করতল
থেকেছে দূরত্বে শুধু একফোঁটা ঘাসের শিশির
আমাকে সমগ্রে তার ডেকে নিয়ে গেছে
ছিল কি আমার স্বপ্নে কোনো জিজ্ঞাসার ভার '
(১২)
একের পর এক কবিতায় নিজস্ব শব্দের ঢেউ তোলেন তপন রায়। কবি যেন প্রত্যাবর্তনের ঝুঁকি নিয়েই বসে আছেন তিনি । অসম্ভব এক জীবন অভীপ্সা তাঁর কবিতায় খুঁজে পাই। তিনি যেন বহু স্বরের একক উত্তরণ।
' ভোরের দুঃখ যদি সন্ধ্যাবেলা ঘরে
ফিরে আসে, দরোজায় দেয় মৃদু টোকা
অবিন্যস্ত চুল, তার, ঝুলে-পড়া মুখ
চোখের পলকে দেখে নিয়ে হয়তো তোমার
মনে পড়ে যাবে সব।
…
হয়তো অন্ধ মা কবে থেকে ভাত বেড়ে বসে
বসবে না খেতে একসাথে ?'
(৮)
এখানে আছে স্নানের জল, দাড়ি কামাবার টুকিটাকি; আছে জন্মের হারানো দাগ,যত্নে রাখা পুরনো পাজামা আর অবশ্যই নতস্বরে ডাক দেওয়া একটি মানুষ। বিশ্বায়ন নব্বইয়ের কবিতার একটি আলাদা দর্শন তৈরি করে দিয়েছিল। এই সময়টা ভাঙা গড়ার সময়। রাশিয়ার ভাঙন থেকে শুরু করে চীনের উত্থান, উপসাগরীয় যুদ্ধ— মিলেমিশে একটা নতুন পৃথিবীর দিকে মানুষকে নিয়ে যাচ্ছিল। যেখানে ভারতের নব্য সংস্কার নতুন এক উৎপাদন ব্যবস্থাকে স্বীকৃতি জানায়। মনে রাখতে হবে এই সময়ে ধর্মের ক্ষেত্রেও ঘটে এক বিরাট ঘটনা। মন্দির মসজিদ সম্পর্কিত সেই ঘটনা ভারতের জনজীবনে অদৃশ্য রেখা টেনে দিয়ে যায়। সাইবার যুগের সূচনা আবার এই দশকের। তাই নাগরিক ভাষা ও মননের জন্ম হতে থাকে । নতুন এই শব্দবন্ধ অভিধান মুক্ত জীবনের কথা বলে । বলে জীবন অভিজ্ঞতার কথা। যে অভিজ্ঞতা একটা রাষ্ট্রকে মুক্তবাজারের মতো খোলা রেখে ' বিপন্ন বিস্ময় ' করে তোলে। একশ্রেণীর সুবিধাবাদে ভরে ওঠে রাষ্ট্র সমাজ শিল্প বাণিজ্য।
এই সময়ে কলকাতাকেন্দ্রিক 'স্মার্ট' কবিতার একটা ঢেউ ওঠে। যা আসলে নামকরণটুকু নিয়েই সার্থক । আসলে প্রকৃত কবিতা সবসময়ই স্মার্ট। তাকে আত্মপ্রচার করতে হয় না। সেখানে উত্তরবঙ্গের বসে তপন রায় লিখছেন তাঁর নিজস্ব অনুভূতির জগত। সে জগতে আছে ' কমবেশি ছিঁড়ে নেয়া যায় ' এমন সব শব্দবন্ধ পংক্তিমালা।
'চেয়েছি সামান্য কাজ সহজ বেতন কত না সহজে '
'একটি অমল-বুড়ো বারংবার যায় যুবা পিওনের কাছে '
'একটি বিষণ্ণ বক শুধু পুরনো অভ্যাসে এসে দাঁড়িয়েছে দূরে '
'মুস্তাফা দর্জির কাছে
ব্রহ্মের জামার মাপ লেখা আছে '
এমন আরো কত কত পংক্তি শব্দমালা আমাদের মনে সংগোপনে কাজ করে যায় । আমরা বুঝতে পারি তপন রায় শুধু কবিতা চর্চার মধ্যেই নিজেকে আটকে রাখেন নি। তাঁর আত্মা,তাঁর আদান-প্রদান প্রকৃতির সঙ্গে মিশে জীবনের সেই অন্ধকারের দিকে যাত্রা শুরু করেছে, যেখানে বর্তমান এবং অতীত একই সঙ্গে তাদের ভালোবাসার কথা জানায়। জানায়, আধিপত্যকামী শক্তি নয়; এই পৃথিবীতে শেষ পর্যন্ত বেঁচে থাকে প্রেমিক-প্রেমিকারাই।
এই শহরের ভেতর রয়েছে আমাদের সাদামাটা জীবনের গোপন ইচ্ছেগুলো। আমরা যতই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ি না কেন, কোথাও একটা তৃষ্ণা গোপনে গোপনে কাজ করে ভেতরে। তাই এই মামুলি জীবনটাকে সুন্দর করে সাজিয়ে তুলতে আমাদের চেষ্টার অভাব নেই। সেই কাজ প্রতিনিয়ত করে চলেছেন সৃষ্টি কর্মে রত মানুষেরা। কবিতার ভেতর সেই বিপুল আয়োজন আরো একবার লক্ষ্য করে নিজেদের ক্ষুধা-দারিদ্র-অপুষ্টিকে ভুলে যেতে মুহূর্তমাত্র সময় লাগে না।
Comments
Post a Comment