ক বি অ রূ প দ ত্ত
অরূপ দত্ত
জন্ম:- ৩১ আগস্ট, ১৯৬৯। দক্ষিণ ২৪ পরগনা, ডায়মন্ডহারবার থানার অন্তর্গত কামারপোল নামক গ্রামে। ছোটবেলা থেকেই কবিতার প্রতি ভালোবাসা। পদাতিক, গ্রামনগর, শূন্য দশক পত্রিকা সহ বিভিন্ন লিটিল ম্যাগাজিনের সাথে নিবিড় যোগাযোগ। প্রায় দীর্ঘ তিরিশ বছর ধরে লেখা লিখি। প্রথম প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ, ' মৃত্যুর নিজস্ব বিছানা' তার পর যথাক্রমে ' জোনাকি প্রলাপ ' ও ' ক্ষত পরিক্রমা ' এখনো নিয়মিত কবিতার সাথেই ঘর গেরস্হালি।
অরূপ দত্ত
যাপন একটা সম্পর্ক,কখন কার সাথে তৈরি হয়ে যায় আমরা জানতেও পারি না। হয়তো আগেই আমার প্রবেশ পথটা একলা একটা নদীর মতন সহজ হয়ে গিয়েছিল, যেহেতু আমি তাঁর অত্যন্ত প্রিয় বন্ধুর ভাই।আমরা সবাই চাইলেই যেমন সকালটা সুন্দর অথবা মন্দ হয়না, তেমনই যৌবন খুব ছোট একটা সময় ধরে ধরে বেশ কয়েকটি ছবির দিকে আমাদের নিয়ে যায়। আমাদের জীবন যাপনে তখন আরো ভালো করে মিশে যায় দিন এবং রাতের নক্ষত্ররাজি। প্রথম আলাপের দিনটি আচমকাই এসেছিল আমার জীবনে। কবিতার সূত্রে ভালো লাগলো মানুষটাকে, আপনার করে নিতে খুব কমই সময় নিয়ে ছিলেন বোধহয়।অনেক অনেক ভালো বন্ধু বা শুভাকাঙ্ক্ষী পরবর্তী কালে পেলেও রফিকদার হৃদয়ের আন্তরিক চিত্রটি অমলিন থেকে গেছে আমার কাছে আজীবন। আজও কোন একটি নতুন কবিতা ধারণ করলে আগে তাঁর কথা মনে পড়ে।এমন একজন অগ্ৰজ কবিকে যারা দাদা হিসেবে পায়নি তাদের জন্য কষ্ট হয়। তাঁদের দিকে তাকিয়ে থাকি, মাঝে মধ্যে যারা চাটুকারিতা দিয়ে সম্পর্ক ধরে রাখার চেষ্টা করেন। আমাদের মধ্যে কাব্য ছাড়া আর কোন ধর্ম ছিল না কোনদিন। একজন কবি যে কবিতা ছাড়া যাপন করতে পারেন না, তা আমি প্রতিনিয়ত চাক্ষুস করতাম তাঁর মধ্যে। তাদের জন্য আমার এই লেখা যারা সম্পর্কের মধ্যে বেঁচে থাকতে চান। আমাদের যাপন আরো সুন্দর করে তুলতে উভয়ের মধ্যেই একটা অদ্ভুত তাগিদ ছিল, সকাল গড়িয়ে দুপুর গড়িয়ে যেতো আমাদের আড্ডা। দেশ কাল পেরিয়ে, যাবতীয় সঙ্কীর্ণতা পেরিয়ে আমরা পুনরায় আকর্ষণের কেন্দ্রে ফিরে আসতাম, যেখানে শুধু কবিতা আর কবিতা। বলতে পারেন কবিতাই ছিল আমাদের একমাত্র ধর্ম। সেখানে ঈশ্বর কবি রফিক উল ইসলাম।আমি তাঁর মন্ত্রমুগ্ধ শিষ্য। কিন্তু হৃদয়ের মাঝে এক বোধ কাজ করতো আমার, ভালোবাসার মানুষটিকে কোনদিন প্রণাম করতে পারিনি। এবার প্রণাম করবো আমার কবিতার বই, "বিষণ্ণরেখা" বইটি সামনে রেখে। আমি তাঁর কথা আজ সর্বসমক্ষে জানালাম তাঁর অনুমতি ছাড়াই, জানিনা ঈশ্বর কি মনে করবেন! এবার আসা যাক তাঁর লেখায়…
"লাঙল যার জমি তার
কিন্তু ফসল?"
কবি ও বিশিষ্ট গদ্য লেখক রফিক উল ইসলামের কাব্য গ্ৰন্থ, "জলের মতো সুখে আছি" থেকে নেওয়া একটি কবিতার দুটি লাইন।
এতো সহজ কথা,কে না জানে? তবু এই সহজ প্রশ্নের উত্তরটা কিন্তু আমাদের মনকে নাড়া দিয়ে যায়।
"এক একটা রাত জেগে থাকতে হয় নিজের কুশপুত্তলিকায় আগুন দেওয়ার জন্যে।"
কবি রফিক উল ইসলাম জানেন, কোন ঘ্রাণ অথবা কোন অক্ষর কাব্যরসিককে পাগল করে তুলতে পারে। মনটা ভরে যায়, ভারাক্রান্তও হয় কখনোবা।
"আমরা জ্বলছি। উল্কার টুকরোগুলো ছড়াতে ছড়াতে শুরুর দিকে ফিরছি।"
না, এখানে কোন ধর্মের কথা নেই। কিন্তু এ ধরনের লেখায়, অনেক সহজেই সময়কে ধরে ফেলা যায়।
"যদি কোনদিন বৃষ্টি ফিরে আসে,যদি ফিরিয়ে দেয় কিছু..." এ ধরনের লেখায় পাঠক অনায়াসে তার অনেক ভালোলাগা নিয়ে একটি কল্পরাজ্যে চলে যেতে পারেন।
"মৃগ এবং মৃগনয়নারা ছড়িয়ে আছে যে-মেঘের ফাঁকে, তাদের সাথে ফুল কুড়োব।" আগের মতই নিমগ্ন তিনি, যিনি এই ভাবে ধারাবাহিক কবিতার মধ্যে, নিজস্ব অক্ষর বিছিয়ে থাকেন, তিনিই কবি, তিনি রফিক উল ইসলাম।
"এ ঘরের অতিথি বলতে আমি আর আমার ঘাতক" তাঁর কবিতা অনুভব করতে হলে প্রবেশ করতে হয় এমনই একটি ঘরে... খুব স্বাধীন এবং ইচ্ছা মতো উড়তে পারে তাঁর কবিতার প্রতিটি অক্ষর।
"যে যার নিজস্ব নিয়মে আপন দেশে ফেরে।" আমাদের আপন দেশ বলতে নিজস্ব ভালোবাসার জগৎ, যেখানে বন্ধু বা বন্ধু'রা ভালোবাসা নিয়ে অপেক্ষা করে আবহমান... "আমাদের হাতে হাতে ভারি পাথর বাঁধা, কোমরে দূর্বোধ্য শিকল।" আমার অনেক অনেক ভালোবাসার পঙক্তি। জানিনা, কি উপকরণের মধ্যে দিয়ে উঠে আসতে পারে এমন সব লাইন!
"ভালো মানুষদের সঙ্গে সবসময় কীরকম এক অজানা ঈশ্বরের গন্ধ লেগে থাকে।" আমার অনেক অনেক ভালোবাসা নিও দাদা, এই গন্ধটা আমি তোমার কাছেও পাই।আমি জানি আরো অনেক সুগন্ধির মতো ঈশ্বরও এক গন্ধময় অনুভূতি। বেশি সময় ধরে তাঁকে অনুভব করতে হয়। হাতে,কলমে জড়িয়ে নিতে হয় মায়া।
অন্য কিছু না বলে শুধু এইটুকু জানিয়ে রাখি, তিনি রফিক উল ইসলাম, এই ধরনের লেখায় অভ্যস্ত এক কবি, বিশেষ কারণ ব্যাতীত যিনি একটি লাইনও লেখেন না। কারণটা কখনো ব্যক্তিগত, কখনো বা সর্বজনীন, কিন্তু যতক্ষণ না তিনি নিজে কিছু অনুভব করেন, ততক্ষণ তিনি একটি লাইনও লেখেন না।
"জলের মতো সুখে আছি" কবি রফিক উল ইসলামের প্রথম কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয় ১৯৮৫ সালে। ততদিনে তিনি অনেক পরিনত,যখন নির্জনতা ছুঁয়ে তিনি দ্বিতীয় কাব্যগ্ৰন্থে প্রবেশ করছেন,"শব আর শব্দ ভৈরবী" সাল ১৯৮৯। আমার রবিবারগুলো তখন প্রায় তাঁর বাড়িতেই কাটতো, সেই সুবাদে আমি জানি এই গ্ৰন্থটি তাঁর কতটা প্রিয়, পাঠক এবং ব্যক্তিগতভাবে আমারও। দরদ ভরা সেই সব কবিতা আজও সমানভাবে ভালোলাগা। এরই পাশাপাশি আবার শুরু হলো তাঁর নতুন আঙ্গিকের খোঁজ। তখন তাঁর সকাল শুরু হতো যেন কবিতার খোঁজে... প্রকাশিত হলো তৃতীয় কবিতার বই,"মৈত্রেয় রাত্রির পথে"। ১৯৯৩ সালে, তিনি তখন এক দক্ষ কারিগর, প্রতিনিয়ত শব্দ ভাঙেন, শব্দ গড়েন। আপনিও মুগ্ধ হবেন পাঠক, ওই গ্ৰন্থের একটি সম্পূর্ণ কবিতা আপনার জন্য, কবিতাটির নাম- নূপুর। তারপর রথের চাকার মতন ক্রমাগত গড়িয়েছে তাঁর লেখা আধুনিকতার দিকে। চতুর্থ কাব্যগ্ৰন্থ প্রকাশিত হয় ১৯৯৭ সালে," আমাদের বৃষ্টিপাতের মাঝখানে"। ২০০১ সালে
প্রকাশিত হয় "সোনালি শিবির"। 'শিশির যেখানে থমকে আছে রৌদ্রছায়ায়, ওই আমাদের গুরুগৃহ।' এমন অনেক পঙক্তি আপনাকে মুগ্ধ করবে পাঠক, আমি নিশ্চিত। "প্লাবনরেখা ছুঁয়ে" প্রকাশিত হয় ১৪০৮ বঙ্গাব্দে। ২০০৫ সালে প্রকাশিত হয় "ভিন গাঁয়ের কথাটি"। তারপর তাঁর উল্লেখযোগ্য একটি কাব্যগ্ৰন্থ, "জিয়ারত"। প্রকাশকাল ২০০৯। তথ্য দিয়ে হয়তো কবি বা লেখককে সমৃদ্ধ করা যায়, কিন্তু সেখানে উৎকর্ষতার প্রমান থাকে না। তাই বলবো আশির এই কবিকে পড়ুন ভালো লাগবে,বাংলা কবিতা এতো নরম সুরে বাজাতে পারেন যে গুটিকয় কবি, অবশ্যই রফিক উল ইসলাম তাঁদের একজন। ২০১২ সালে প্রকাশ পায়,"অর্ধেক চাঁদের জন্যে"। ২০১৪ সালে "আটাশ কিংবা ছাব্বিশ" ২০১৮ সালে প্রকাশিত হয়, "অবসরের পর সেলফি" এই গ্ৰন্থটির প্রকাশ কালের কাছাকাছি সময়ে তিনি সত্যি সত্যিই দীর্ঘ চাকরি জীবন থেকে অবসর গ্ৰহন করেন। তাই বইটি আলাদা মাত্রা যোগ করে পাঠকের মননে। ২০২১ সাল, ছোট ছোট চার লাইনের কবিতা সংকলন প্রকাশিত হলো, নাম "অঘোরে ঘুমিয়ে চন্দ্রকণা" নিভৃত চন্দ্রকণারা সত্যি
সত্যি ঘুমিয়ে থাকে তাঁর কবিতায়। কবিতার নাম, ভোরের প্রার্থনা, " তোমাকে হারানো পৃথিবীর কোনও কোণে যেন আমিও না-থাকি আর, যেন ক্লাস শেষ হবে, জীবনের বোর্ড থেকে আমাকে মুছে দিও ডাস্টার!" প্রেমের এই আকুতি, আমার মনে হয় একজন তরুণ কবির পক্ষেও লেখা খুব কঠিন,যদি তার হৃদয় এভাবে না বেজে উঠতে পারে। এখানেই তাঁর বিশেষত্ব, এখানেই তাঁর অমরত্ব। কবি রফিক উল ইসলামের বেশ কয়েকটি গদ্যগ্ৰন্থও প্রকাশিত হয়েছে,আমি সে প্রসঙ্গে আজ যাবো না, কিন্তু ছোটদের জন্য তাঁর কবিতার বই "হাওয়ার কানে মেঘের দুল" ২০১১ সালে প্রকাশিত এই বইটির উল্লেখ না করলে তাঁর প্রতি সুবিচার হবে না, কারণ ব্যক্তিগত ভাবে আমি মনে করি, তিনি যদি ছোটদের জন্য আরো বেশি করে লিখতেন তবে তা অবশ্যই বাংলা সাহিত্যের সম্পদ হয়ে থাকতো।
বলতে দ্বিধা নেই একান্ত প্রিয় এই কবির কাছেই আমার যৎসামান্য লেখা-লেখির হাতেখড়ি। এই অবসরে আপাতত এইটুকু জানিয়ে বিদায় নিচ্ছি। আবার কখনো হয়তো তাঁকে নিয়ে লিখতে হবে, সেদিন আরো সমৃদ্ধ কিছু লেখার চেষ্টা অবশ্যই করবো। অচেনা নক্ষত্র'কে এ জীবনে যেটুকু চিনেছি, আবার জানাবো সেদিন।

Comments
Post a Comment